‘প্রাণায়াম’ একটি সংস্কৃত শব্দ, যা এসেছে ‘প্রাণ’ শব্দ থেকে যার অর্থ শ্বাস এবং ‘আয়ম’ অর্থ ব্যপ্তি অথবা নিয়ন্ত্রণ, অর্থাৎ মূল শব্দের অর্থ শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ। এর আক্ষরিক অর্থের ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে,, প্রাণায়াম শুধু মাত্র নাকের সাহায্যে বাতাসের প্রশ্বাস এবং নিঃশ্বাস নয়, তার চেয়ে অনেক বড় বিষয়। এর মূল অর্থ, আমাদের ‘প্রাণ’ অর্থাৎ প্রাণশক্তির উৎস নিয়ন্ত্রণ।

প্রাণায়াম হচ্ছে যোগাভ্যাসের একটি নিয়ম, যার উদ্ভব পঞ্চম এবং ষষ্ঠ খ্রিষ্টপূর্বের প্রাচীন ভারতে, ‘‘ভগবৎ গীতা’’ খুললে তার উল্লেখ পাওয়া যাবে। সেই প্রাচীন কাল থেকে ভারতকে অনুশীলনের কেন্দ্রবিন্দু করে বিভিন্ন দিকে প্রাণায়ামের ব্যপ্তি ছড়িয়েছে।

প্রাণায়াম বলতে শুধু শান্তি এবং সংযমের জন্য যোগাভ্যাসের পদ্ধতি নয়, যোগী এবং গবেষকেরা বলেছেন, প্রাণায়ামের সাহায্যে কিছু রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব, বিশেষ করে মানসিক চাপজনিত অসুস্থতার ক্ষেত্রে তা বিশেষ উপকারী।

প্রাণায়ামের বিভিন্ন কৌশলের মধ্যে জনপ্রিয়তা এবং কার্যকারিতার জন্য অনুলোম বিলোম কৌশল সবচেয়ে বেশি অনুসৃত হয়ে থাকে। দু’টি নাসারন্ধ্রের একটির পর অন্যটি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়া এবং শ্বাস ছাড়াই হচ্ছে অনুলোম বিলোম এবং সেটিই প্রাণায়ামের শ্রেষ্ঠ কৌশল। এটি আপনার মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র এবং শরীরের জন্য খুব উপকারী, এবং এর উপকার, পদ্ধতি এবং সতর্কতামূলক পদক্ষেপ সম্পর্কে আলোচনা পরে করা হবে।

  1. অনুলোম বিলোম প্রাণায়ামের উপকার - Anulom Vilom Pranayama benefits in Bengali
  2. মস্তিষ্কের উপকারে অনুলোম বিলোম - Anulom Vilom benefits brain in Bengali
  3. অবসাদ কাটাতে অনুলোম বিলোম - Anulom Vilom for depression in Bengali
  4. ত্বকের উপকারে অনুলোম বিলোম - Benefits of anulom vilom for skin in Bengali
  5. চোখের উপকারে অনুলোম বিলোম - Benefits of anulom vilom for eyes in Bengali
  6. হার্টের উপকারে অনুলোম বিলোম - Benefits of anulom vilom for heart in Bengali
  7. শ্বাসের উপকারের জন্য অনুলোম বিলোম - Anulom Vilom breathing in Bengali
  8. গর্ভাবস্থায় অনুলোম বিলোম - Anulom Vilom during pregnancy in Bengali
  9. ওজন কমাতে অনুলোম বিলোম - Anulom Vilom for weight loss in Bengali
  10. অনুলোম বিলোমের জন্য কত সময় দেবেন - How much time to do anulom vilom for in Bengali
  11. অনুলোম বিলোমে কতটা নিরাপদ? - How safe is anulom vilom? in Bengali
  12. অনুলোম বিলোম পদক্ষেপ - Anulom Vilom steps in Bengali

দৈনিক 5 থেকে 6 মিনিট সঠিকভাবে অনুলোম বিলোম প্রাণায়াম করা হলে মানসিক শান্তির জন্য সাহায্য ছাড়া স্বাস্থ্যের প্রভূত উপকার হয়। আমাদের নাকের দুটি ছিদ্র, নির্দিষ্ট সময় ধরে পর্যায়ক্রমে একটির পর অন্যটি সারা দিন ধরে শ্বাস গ্রহণ এবং কার্যপ্রণালী চালু রাখে। সুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শ্বাস গ্রহণ এবং বর্জনের এই চক্র 24 ঘণ্টা ধরে  চলতে থাকে, অসুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে এই চক্র বিঘ্নিত হয়। অনুলোম বিলোমের অভ্যাস এই ছন্দ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে, তার মধ্যে সমতা এবং ভারসাম্য আনে এবং শরীরে প্রাণপ্রবাহ সজীব করে ।

  • মস্তিষ্কের জন্য: অনুলোম বিলোমের প্রভাবে মস্তিষ্কে প্রশান্তি এবং স্বস্তির ভাব নিয়ে আসে, ফলত অবসাদ প্রতিরোধে সাহায্য হয়। শারীরিক কাজকর্মের উন্নতি হয় এবং বার্ধক্যজনিত স্মৃতিভ্রংশের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
  • ত্বকের জন্য:    অনুলোম বিলোমের জন্য ব্রণ বা অ্যাকনি এবং ত্বকের রোগের উপশম হয় বলে ত্বকের উপকার হয়।
  • চোখের জন্য:  অনুলোম বিলোম প্রাণায়ামের ফলে চোখে রক্তপ্রবাহ বাড়ার দরুন চোখের দৃষ্টি শক্তির উন্নতি হয়, এবং দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয় না।
  • হার্টের জন্য:    অনুলোম বিলোম রক্তচাপ কম রাখতে সাহায্য করে এবং এবং এই কারণে কার্ডিওপ্রেটেক্টিভ প্রক্রিয়া হয়ে থাকে, কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার ঝুঁকি কমে।
  • ফুসফুসের জন্য: যেহেতু অনুলোম বিলোম কোনও ব্যক্তির শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ায়, এটির অভ্যাস করলে অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণ করা সুবিধা হয়। এটি শরীরে শ্বাসের জন্য বায়ুপ্রবাহের গতি ত্বরান্বিত করে এবং ঘড়ঘড়ানি এবং ডিস্পনিয়া বা শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করে।
  • ওজন কম করার জন্য:  সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অনুলোম বিলোম অভ্যাস করলে শরীরে ওজন কমাতে সাহায্য হয় এবং শারীরিক নমনীয়তার উন্নতি হয়।
  • মহিলাদের জন্য:  গর্ভাবস্থায় অনুলোম বিলোম অভ্যাসের ফলে মাতৃত্বকালীন অবসাদের ঝুঁকি কমে, যা চিকিৎসা না হলে প্রসবের পরেও থেকে যেতে পারে। গর্ভবতী নন এমন মহিলাদের ক্ষেত্রে এই কৌশলের সাহায্যে মাসিকের অব্যবহিত পূর্বে বিভিন্ন উপসর্গের হার কমায়।

আপনার মস্তিষ্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অনুলোম বিলোম ‘ক্রিয়া’ -র (অ্যাক্ট) ফলে চমকপ্রদ উপকার হয়।

এটি আপনার মন শিথিল করে এবং প্রাত্যহিক কাজকর্মের দরুন যে চাপ সৃষ্টি হয় তা থেকে আপনাকে মুক্ত করে। শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ এবং তা বিলম্বিত করার প্রক্রিয়ায় মানসিক শান্তি আসে এবং স্থৈর্যের উন্নতি হয়। মস্তিষ্কের ওপর যে নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া দেখা যায় তার সার কথা হল সৃষ্টিশীলতা এবং বৌদ্ধিক চিন্তার মধ্যে সমন্বয়। মস্তিষ্কের উভয়দিকে কার্যপ্রক্রিয়া সমানতালে চালিত করে বলে এটি সম্ভব হয়, মস্তিষ্কের ডান দিকের অংশ সৃষ্টিশীলতার জন্য দায়ী, আর অপরদিকে মস্তিষ্কের বাঁদিকের অংশ বৌদ্ধিক চেতনা বৃদ্ধি করে। উভয়ের মাঝে ভারসাম্য বজায় থাকলে মস্তিষ্কের ক্ষমতা সর্বোচ্চ হয় এবং প্রাত্যহিক কাজকর্মে সবচেয়ে সেরা ফল পাওয়া যায়।

বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে অনুলোম বিলোম সবচেয়ে বেশি উপকার দেয়। একাধিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, শ্বাস নেওয়ার সময় পর্যায়ক্রমে একটির পর অন্য নাসারন্ধ্র ব্যবহার করলে বা প্রাণায়ামের কারণে শারীরিক কাজকর্ম (বৌদ্ধিক, বিশ্লেষণী দক্ষতা, এবং স্মৃতি) উন্নতমানের হয়। এই কারণে বিশেষভাবে বয়স্ক মানুষদের বার্ধক্যজনিত স্মৃতিভ্রংশ এড়াতে এই কৌশল রপ্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

(আরও পড়ুন: ট্রিটমেন্ট অফ ডিমেনশিয়া)

মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য এবং প্রক্রিয়ার ওপর ইতিবাচক প্রভাব থাকায় অনুলোম বিলোম বাহ্যিক ব্যবহারের উন্নতি ঘটায় এবং দুশ্চিন্তা, অবসাদ কমায়। পরীক্ষার আগে দুশ্চিন্তা এবং চাপের মাত্রায় প্রাণায়ামের ফলে কোনও হেরফের হয় কিনা তা দেখার জন্য পড়ুয়াদের ওপর করা একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে এটি মস্তিষ্কের মধ্যে প্রশান্ত ভাব নিয়ে আসে। দেখা গিয়েছিল, যে সব পড়ুয়া প্রাণায়াম অভ্যাস করেছিলেন অন্যদের চেয়ে তাঁদের মধ্যে মানসিক চাপ এবং দুশ্চিন্তার হার অনেক কম ছিল। এই অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একটি দুশ্চিন্তার একটি গড় ফল দেখতে পাওয়া যায়।

(আরও পড়ুন: ট্রিটমেন্ট অফ অ্যালঝাইমার ডিজিজ)

অনুলোম বিলোম আপনার ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতিও ঘটাতে পারে। দুশ্চিন্তা রোধ করার প্রকৃত দাওয়াই এটি, উল্লিখিত বর্ণনা মতো এটি উল্লেখযোগ্যভাবে মানসিক চাপ এবং দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করে। আমরা প্রত্যেকেই জানি, মানসিক চাপের ফলে আপনার ত্বকের খুব ক্ষতি হয়। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যে কোনও মানুষের ব্রণ বা অ্যাকনি বাড়ে মানসিক চাপের কারণে। চাপ এবং অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিসের সঙ্গে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক (একটির জন্য বারংবার অন্যটি হয়) আছে বলেও দেখা গিয়েছে। যে কোনও ক্ষতের নিরাময় বিলম্বিত হওয়ার বা বার্ধক্যজনিত ক্ষতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও মানসিক চাপ দায়ী বলে জানা গিয়েছে। যেহেতু অনুলোম বিলোম ব্যক্তিগত মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী সুতরাং আপনার ত্বকের স্বাস্থ্যের ওপর এর ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে।

(আরও পড়ুন: ভাইটামিন E ফর স্কিন )

প্রতিদিন অনুলোম বিলোম অভ্যাস করা হলে আপনার চোখের দৃষ্টি উন্নত হয়। প্রতিদিন সকালে অথবা সন্ধ্যায় যখন খালি পেটে অভ্যাস করা হয় তখন চোখে পারফিউশন (রক্ত সংবহন) উন্নত হয়। প্রভূত পরিমাণ রেটিনাল পেরফিউশন (চোখের মধ্যে রেটিনার যে স্তর থাকে সেটি আপনার দৃষ্টিশক্তির জন্য দায়ী) আপনার দৃষ্টিশক্তির জন্য জরুরি। যদি চোখের মধ্যে রক্তচাপ অত্যধিক হওয়ার কারণে পারফিউশন ব্যাহত হয় তাহলে 4 থেকে 9 সেকেন্ডের মধ্যে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই ঘটনা থেকে আপনার চোখে অক্সিজেনের উপযুক্ত পারফিউশনের গুরুত্ব প্রমাণিত হয়, যা অনুলোম বিলোম অভ্যাসের ফলে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

(আরও পড়ুন: ভাইটামিন A বেনিফিটস ফর আই)

অনুলোম বিলোমের ফলে হার্টের প্রভূত উপকার হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল রক্তচাপ কমানোর ক্ষেত্রে এর ভূমিকা। একাধিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অনুলোম বিলোম অভ্যাসের সময় যেভাবে ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া-ছাড়া হয় তাতে উচ্চ রক্তচাপের (হাইপারটেনসিভ) রোগীদের ক্ষেত্রে রক্তচাপ হ্রাস পায়। কাজেই এটিকে হাইপারটেনশন -এর বিকল্প থেরাপি হিসাবে বর্ণনা করা হয়।

আপনার কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের ওপর অন্যান্য প্রভাব আছে এবং হার্টের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এতে দুশ্চিন্তা কমে, কার্ডিওভাসকুলার সমস্যা, বিশেষত হৃদরোগের আক্রমণ এবং স্ট্রোকের জন্য যা হচ্ছে অন্যতম প্রধান কারণ।

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অনুলোম বিলোম নাড়ির স্পন্দন কমায়, এবং বিশেষ করে যে সব ব্যক্তির হৃদরোগের ঝুঁকি আছে তাঁদের ক্ষেত্রে প্রাত্যহিক অভ্যাসের ফলে মানসিক চাপের বিরুদ্ধে লড়াই করে। হাইপারটেনসিভদের (উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের) ক্ষেত্রে অনুলোম বিলোমের সবচেয়ে উপকারী অভ্যাস হল চন্দ্রা অনুলোম বিলোম, যা তাপ কমায় বা শীতল প্রভাব থাকে। হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণের জন্য এটিকে ঔষধ সংক্রান্ত চিকিৎসার বিকল্প হিসাবে ধরা হয়েছে।

(আরও পড়ুন: ভাইটামিন B3 বেনিফিট ফর হেল্থ)

শ্বাসের সমস্যা বদ্ধির পিছনে অন্যতম কারণ হিসাবে ধরা হয় মানসিক চাপ। এর ফলে অ্যাজমার টান বা আনুষঙ্গিক সমস্যা হয়। চাপযুক্ত হলে আমাদের শরীর থেকে কিছু স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়, যা আমাদের শ্বাসের অভ্যাস পাল্টে ফেলে, কখনও ঘন ঘন নিতে হয়, কখনও তা ধীরে নিতে হয়। এর থেকে কাশির উপসর্গ দেখা দেয় এবং বুকের কাছে টান ধরে, যা অ্যাজমার অনুষঙ্গ। অ্যাজমা বা সংশ্লিষ্ট সমস্যার নিয়ন্ত্রণে অনুলোম বিলোম খুব কাজ দেয়, কারণ এটি চাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং যে কোনও ব্যক্তির শ্বাস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

(আরও পড়ুন: ম্যানেজমেন্ট অফ চেস্ট পেন)

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অনুলোম বিলোম প্রাণায়ামের ফলে শরীরের বায়ুপ্রবাহের (যে পদ্ধতিতে ফুসফুসে অক্সিজেন প্রবাহিত হয়) এবং সাইনাসে (মাথার খুলির নিচে ফাঁপা ছিদ্র) অক্সিজেন সরবরাহের উন্নতি হয়। অক্সিজেন প্রাপ্তির জন্য উন্নত তল সৃষ্টি হয়, যা নাসারন্ধ্রের এপিথেলিয়ামে শোষিত হয়, ফলত শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ে।

(আরও পড়ুন: ট্রিটমেন্ট অফ সাইনাসাইটিস)

ধ্যানের সঙ্গে শ্বাস-প্রশ্বাসের ফলের তুলনা টানতে কিছু মানুষের শ্বাসের স্বাস্থ্যের ওপর অন্য একটি সমীক্ষা করা হয়েছিল। দু’টি দলে ভাগ করা হয়েছিল, যেখানে একটি দল বিভিন্ন শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে অনুলোম বিলোম অভ্যাস করছিল এবং অন্য দলটি গভীর ধ্যানের অভ্যাস করছিল। দেখা গিয়েছিল, যে দলটি শ্বাস-প্রশ্বাসের অভ্যাস করছিল, তাদের মধ্যে অন্য দলের সদস্যদের থেকে কাশি, ঘড়ঘড় শব্দে শ্বাস নেওয়া (শ্বাস নেওয়ার সময় সোঁ সোঁ শব্দ) এবং ডিস্পনিয়া (শ্বাসকষ্ট) অনেক কম ছিল। সুতরাং অ্যাজমার রিগীদের ক্ষেত্রে এই অভ্যাস রপ্ত করতে বলা হয়।

হরমোনের পরিবর্তন হওয়ার জন্য মুডের পরিবর্তন এবং মানসিক চাপ গর্ভাবস্থায় খুব স্বাভাবিক উপসর্গ। এর ফলে মাতৃত্বকালীন অবসাদের ঝুঁকি বাড়ে, যা সন্তান প্রসবের পরেও চলতে থাকে। এরকম জটিল পরিস্থিতিতে অবসাদ কাটানোর জন্য অনুলোম বিলোমের মতো সাধারণ শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রক্রিয়া প্রাত্যহিক পাঁচ মিনিট করে অভ্যাস করতে হবে, যা সমস্যা প্রশমিত করবে। এর ফলে দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা কমবে, এবং অবশেষে মাতৃত্বকালীন অবসাদ থেকে মুক্তি মিলবে। এই কৌশল সাধারণত গর্ভাবস্থায় নিরাপদ বলে চিহ্নিত হয় তবে একজন পেশাদার প্রশিক্ষকের নির্দেশমতো অভ্যাস করা কাম্য।

(আরও পড়ুন: হাও টু গেট প্রেগন্যান্ট)

মহিলাদের প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য অনুলোম বিলোমের অন্য উপকার আছে বলে জানা গিয়েছে। প্রজননকালে উপস্থিত মহিলাদের ওপরে একটি সমীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, প্রাক-রজঃস্বলা অবস্থায় অনুলোম বিলোম অভ্যাস করলে বিভিন্ন উপসর্গের (বিরক্তি, ক্লান্তি এবং মাসিকের আগে ফুলে যাওয়া) হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং এর একটি সার্বিক স্বাচ্ছন্দ্যের প্রভাব আছে। এই কারণে মহিলাদের স্বাস্থ্যের ওপর অনুলোম বিলোমের অভ্যাস উপকারী ভূমিকা পালন করে।.

(আরও পড়ুন: ভাইটামিন B12 রিডিউসেস ডিপ্রেশন)

স্থূলত্ব এবং ওজন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মানসিক চাপ অন্যতম প্রধান কারণ। এটি স্ট্রেস হরমোন, করিস্টোলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা উচ্চ স্নেহ পদার্থ যুক্ত খাদ্য যেমন মিষ্টি এবং চকোলেটের প্রতি আকাঙ্খা বৃদ্ধি করে। মানসিক চাপ বাড়লে খুব স্বাভাবিক ভাবে বেশি ক্যালরি খাওয়ার প্রবণতা জাগে। অনুলোম বিলোম মন শান্ত এবং শিথিল করে, ফলে এইসব খাদ্যের প্রতি আকাঙ্খা এবং প্রয়োজন কমে।

(আরও পড়ুন:  ব্যালান্সড ডায়েট ফর ওয়েট লস)

একদল যুবতীর ওপর অনুলোম বিলোমের প্রভাবের পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, এর ফলে নমনীয়তা এবং ওজন হ্রাসের মতো স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যার উন্নতি হয়েছে। যদিও খুব বেশি উল্লেখযোগ্য নয় তবু প্রভাব বোঝা গিয়েছিল। আপনি এই কৌশলের ওপর ভরসা করতে পারেন এবং মানসিক চাপের ফলে অত্যধিক খাওয়ার অভ্যাস বন্ধ করতে পারেন, যা আপনাকে ওজন কমানোর কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করবে।

(আরও পড়ুন:  ব্যালান্সড ডায়েট ফর ওয়েট লস)

যোগীরা বলছেন, একজন স্বাস্থ্যবান ব্যক্তির জন্য দৈনিক  5 থেকে 10 মিনিট অনুলোম বিলোম ক্রিয়া প্রয়োজন। যে সব ব্যক্তি দীর্ঘস্থায়ী অসুখে ভুগছেন তাঁদের জন্য প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এই কৌশল 10 থেকে 15 মিনিট রপ্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়। আপনি যদি সকালে অনুলোম বিলোম ক্রিয়া না করে থাকেন তাহলে সন্ধ্যায় করতে পারেন, তবে শেষ যখন খেয়েছেন তখন থেকে 5 ঘণ্টার বিরতি যেন থাকে।

তবে এই দাবির সমর্থনে তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য প্রামাণ্য গবেষণা নেই। কাজেই আপনি যদি কোনও ধরনের শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভোগেন তাহলে অনুলোম বিলোম শুরু করার আগে হয় আপনার চিকিৎসক বা হয় পেশাদার প্রশিক্ষকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অ্যাজমা আক্রান্তদের বিশেষ সতর্কতা নিতে হবে এবং বেশিক্ষণ শ্বাস ধরে রাখা বা শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে গিয়ে কিছু করা উচিত নয়।.

(আরও পড়ুন: ট্রিটমেন্ট অফ ক্রনিক অনস্ট্রাকট্রাটিভ পালমোনারি ডিজিজেস)

  • অনুলোম বিলোম হচ্ছে একটি সহজ শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল এবং সঠিকভাবে অভ্যাস করা হলে এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ।
  • যেমন ওপরে বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় ভোগেন তাহলে অনুলোম বিলোম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং পেশাদার প্রশিক্ষকের নির্দেশ মতো অভ্যাস জরুরি।
  • অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সতর্ক থাকতে হবে এবং কোনও প্রশিক্ষিত পেশাদারের অধীনে অভ্যাস রপ্ত করতে হবে।
  • যাঁরা প্রথম শুরু করছেন তাঁদের কোনও প্রশিক্ষিত পেশাদারের অধীনে অভ্যাস রপ্ত করতে হবে এবং প্রথমদিকে শ্বাস এবং প্রশ্বাসের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান রাখা চলবে না।
  • কোনও সময়েই শারীরিক অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ হলে এটি করা চলবে না।
  • যদি বুকে ব্যথা বা অসুবিধা অনুভব করেন তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি বা শারীরিক অবসাদ বোধ হলে এই ক্রিয়া থেকে বিরত হয়ে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

অনুলোম বিলোম প্রাণায়াম অভ্যাস করা বা ধরে রাখা খুব সহজ। নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি অনুসরণ করলে এটি সহজেই অভ্যাস করা যায়। পরামর্শ দেওয়া হয়, পদক্ষেপগুলি করার আগে অনুত্তেজিত অবস্থায়, শান্ত এবং স্বচ্ছন্দ অবস্থায় বসতে হবে। এর ফলে আপনার চারপাশ থেকে আপনি নিজেকে বিযুক্ত করে ফেলতে পারবেন এবং প্রাণায়ামের দিকে পূর্ণমাত্রায় লক্ষ্য কেন্দ্রীভূত করতে পারবেন।

  • পা গুলি আড়াআড়ি রেখে বা ধ্যানের আসন অনুসরণ করে বসুন, মাটিতে বসলেই ভাল হয়। আপনার মেরুদণ্ড এবং মাথা যেন খাড়া থাকে। (আরও পড়ুন: স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি)
  • চোখ বন্ধ করে কয়েক মিনিট বিশ্রাম করুন। এর ফলে আপনি পরিপার্শ্ব থেকে নিজেকে বিচ্যুত করতে পারবেন এবং এটি আপনাকে চাপমুক্ত হতে সাহায্য করবে।
  • যতক্ষণ না শরীর শিথিল হচ্ছে এবং আপনি প্রাণায়ামের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ততক্ষণ কয়েক মিনিট এই অবস্থায় চোখ বন্ধ করে বসে থাকুন।
  • এবার, আপনার ডান হাতের আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে নাকের ডানদিকের ছিদ্রের ওপর রাখুন, আপনার বাঁ হাত বাঁ হাঁটুর ওপরে রাখুন।
  • জোর করে টিপে ধরুন যাতে এই ছিদ্র দিয়ে সাময়িকভাবে বাতাসের প্রবাহ বন্ধ হয়।
  • এবার, ধীরে ধীরে বাঁ নাসারন্ধ্র দিয়ে গভীর শ্বাস টানুন।
  • দুটি ছিদ্র বন্ধ করুন, ভিতরে যে শ্বাস নিয়েছেন তা কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখুন।   
  • এবার, ডানদিকের ছিদ্রের ওপর থেকে আঙুল সরিয়ে নিন, যার ফলে আপনি এই ছিদ্র দিয়ে শ্বাস ছাড়তে পারবেন।
  • যখন এ কাজ করবেন মনে রাখবেন তখন যেন বাঁদিকের ছিদ্র অনামিকা এবং কনিষ্ঠার সাহায্যে শক্ত ভাবে বন্ধ থাকে।
  • যত দ্রুত শ্বাস নিয়েছিলেন, ডান দিকের ছিদ্র দিয়ে শ্বাস তার চেয়ে ধীরে ছাড়ুন।
  • এর পর, ডান দিকের ছিদ্র দিয়ে গভীরভাবে শ্বাস নিন, অন্য নাসারন্ধ্র অনামিকা এবং কনিষ্ঠা দিয়ে বন্ধ রাখুন।
  • এক ভাবে দুটি নাসারন্ধ্র বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখুন।
  • অবশেষে, ডান দিকের নাসারন্ধ্র বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে চেপে রেখে বাঁ দিকের ছিদ্র দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন।
  • মনে রাখবেন, শ্বাস নেওয়ার চেয়ে শ্বাস ছাড়া যেন ধীর গতিতে হয়।

এটি করা হলে অনুলিম বিলোমের একটি চক্র সম্পূর্ণ হবে। উল্লিখিত পদক্ষেপ এবং নাসারন্ধ্রগুলি পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন করে পরবর্তী পর্যায় শুরু হবে। উপকার পেতে হলে দৈনিক 5 থেকে 6 বার অনুসরণ করা যেতে পারে।

মনে রাখবেন নতুন যাঁরা শুরু করছেন তাঁদের ক্ষেত্রে শ্বাস গ্রহণের চেয়ে শ্বাস ছাড়ার সময় বেশি দীর্ঘ হওয়া জরুরি নয়। শ্বাস গ্রহণ এবং শ্বাস ছাড়ার সময়ের অনুপাত প্রথমদিকে এক রেখে ক্রমে শ্বাসগ্রহণ এবং পরিত্যাগের সময়ের অনুপাত 1:2 করে বাড়াতে হবে।

তথ্যসূত্র

  1. National Hindu Student's Forum. Pranayama: The power of breathing. U.K [Internet]
  2. Ministry of AYUSH, Govt. of India. Common Yoga Protocol. [Internet]
  3. Azadeh Nemati. The effect of pranayama on test anxiety and test performance. Int J Yoga. 2013 Jan-Jun; 6(1): 55–60. PMID: 23439436
  4. Ying Chen, John Lyga. Brain-Skin Connection: Stress, Inflammation and Skin Aging. Inflamm Allergy Drug Targets. 2014 Jun; 13(3): 177–190. PMID: 24853682
  5. Robert A. Linsenmeiera, Hao F. Zhang. Retinal Oxygen: from animals to humans. Prog Retin Eye Res. 2017 May; 58: 115–151. PMID: 28109737
  6. Atul Bhardwaj, Mahendra Kumar Sharma, Manoj Gupta. Endoscopic evaluation of therapeutic effects of “Anuloma-Viloma Pranayama” in Pratishyaya w.s.r. to mucociliary clearance mechanism and Bernoulli's principle. Ayu. 2013 Oct-Dec; 34(4): 361–367. PMID: 24696572
  7. Tarun Saxena, Manjari Saxena. The effect of various breathing exercises (pranayama) in patients with bronchial asthma of mild to moderate severity. Int J Yoga. 2009 Jan-Jun; 2(1): 22–25. PMID: 21234211
  8. Center for Disease Control and Prevention [internet], Atlanta (GA): US Department of Health and Human Services; Depression During and After Pregnancy
  9. Sharma B, Misra R, Singh K, Sharma R, Archana. Comparative study of effect of anuloma-viloma (pranayam) and yogic asanas in premenstrual syndrome. Indian J Physiol Pharmacol. 2013 Oct-Dec;57(4):384-9. PMID: 24968577
  10. Harding JL. Psychosocial stress is positively associated with body mass index gain over 5 years: evidence from the longitudinal AusDiab study. Obesity (Silver Spring). 2014 Jan;22(1):277-86. PMID: 23512679
  11. A. Scott, Susan J. Melhorn, Randall R. Sakai. Effects of Chronic Social Stress on Obesity Karen. Curr Obes Rep. 2012 Mar; 1(1): 16–25. PMID: 22943039
  12. Hewagalamulage SD, Lee TK, Clarke IJ, Henry BA. Stress, cortisol, and obesity: a role for cortisol responsiveness in identifying individuals prone to obesity. Domest Anim Endocrinol. 2016 Jul;56 Suppl:S112-20. PMID: 27345309
  13. Rajita Sinha, Ania M. Jastreboff. Stress as a common risk factor for obesity and addiction. Biol Psychiatry. 2013 May 1; 73(9): 827–835. PMID: 23541000

সংস্কলিস্ট প্রবন্ধ